প্রশ্নফাঁস চক্রে সরকারি চাকুরেরা অপ্রতিরোধ্য চক্রের সদস্যরা

প্রশ্নফাঁস চক্রে সরকারি চাকুরেরা

                                                                                                                      প্রশ্নফাঁস চক্রে সরকারি চাকুরেরা

কেউ একের পর এক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন, কেউ শেষ সম্বলটুকু খরচ করে ছুটছেন চাকরির পেছনে। অথচ পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন পৌঁছে যাচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীর হাতে। আগের রাতে গোপন আস্তানায় বসিয়ে মুখস্থ করানো হচ্ছে উত্তর। আর এই পুরো কারবারের নেপথ্যে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে গড়ে ওঠা এক সংঘবদ্ধ চক্র। প্রশ্ন সংগ্রহ, হাতবদল, পরীক্ষার্থী জোগাড় থেকে শুরু করে গোপন বুথে উত্তর মুখস্থ করানো পর্যন্ত চক্রের সদস্যদের দায়িত্ব ছিল আলাদা। কালবেলার অনুসন্ধানে অন্তত ১১টি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসে এই চক্রের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে।

সর্বশেষ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের সূত্র ধরে বেরিয়ে এসেছে বিস্তৃত এই নেটওয়ার্কের তথ্য। এতে উঠে এসেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, খাদ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম, ইতোমধ্যে যে ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। প্রশ্নফাঁসের ঘটনা নিয়ে কাজ করা একাধিক সূত্রের কাছ থেকে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন তথ্য ও প্রমাণ এসেছে কালবেলার হাতে।

যুব উন্নয়ন অধিপ্তরের প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় এরইমধ্যে মতিঝিল থানায় মামলা হয়েছে। মামলাটি করেছেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুর রহমান। তিনি প্রবাসী সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল ইমরানের ফেসবুক পোস্টে প্রশ্নফাঁসের বিষয়টিকে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন মামলায়।

অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই নেটওয়ার্কের বিস্তার শুধু একটি দপ্তর বা কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, আর্মি হেডকোয়ার্টার্স, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, খাদ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই সিন্ডিকেট। এখানে কেউ কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী, কেউ আছেন প্রশ্ন ও পরীক্ষার্থী সংগ্রহের দায়িত্বে, কেউ এক স্তর থেকে আরেক স্তরে প্রশ্ন পৌঁছে দেন, আবার কেউ কাজ করেন পরীক্ষার্থী সংগ্রহ ও মাঠপর্যায়ের যোগাযোগে। সব মিলিয়ে প্রশ্নফাঁসের একটি বহুস্তরীয় নেটওয়ার্কের তথ্য-প্রমাণ এসেছে কালবেলার হাতে।

যেসব পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস

প্রশ্নফাঁসকাণ্ডে আটকদের দেওয়া তথ্য, তাদের মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ টেক্সটিং পর্যালোচনা করে অন্তত ১১টি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এসব পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা, হিসাব সহকারী, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, উপ খাদ্য পরিদর্শক, খাদ্য মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের বিভিন্ন পদের নিয়োগ পরীক্ষা, অডিটর, কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্স (সিজিডিএফ), পরিবেশ অধিদপ্তর, নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন পদের নিয়োগ পরীক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন পদের নিয়োগ পরীক্ষা, রাজশাহী পোস্টাল অপারেটর এবং মেইল অপারেটর নিয়োগ পরীক্ষা।

অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান কর্মকর্তা সুজিত গোপ। পুরো কার্যক্রমে মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন তিনি। গা ঢাকা দেওয়ায় সুজিত গোপকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সুজিত গোপকে গ্রেপ্তার করা গেলে তার ওপরে আর কেউ আছে কি না সেই তথ্য পাওয়া যাবে। সুজিত গোপের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে কাজ করেন কয়েকজন সহযোগী। তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহকারী আসাদুল হাবিব, একটি ট্যাক্স ফার্মের কর্মচারী নূর মোহাম্মদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিম্নমান সহকারী বা পেশকার জাহাঙ্গীর আলম এবং চক্রের সদস্য এস এম এমদাদুল রহমান। তাদের দায়িত্ব নেটওয়ার্কের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশ্ন ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া। এমদাদুলের দায়িত্ব মতিঝিল এলাকার। এই এলাকায় যেসব পরীক্ষার্থীর পরীক্ষার সিট পড়ত তাদেরকে গোপন বুথে প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করাতেন এমদাদুল। তার গোপন বুথ ছিল মতিঝিল এলাকায়। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরীক্ষায় মতিঝিলের বুথে এমদাদুল এবার ১৫ জনকে প্রশ্ন পড়িয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এই চক্রের চারজনকেই গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি। এরপর তাদের কাছ থেকে প্রশ্ন যেত মফিজুল ইসলাম ওরফে রাফি ও হাসিনুর রহমান সুজন নামের দুজনের কাছে। এই দুজনকেও ইতোমধ্যেই আটক করা হয়েছে। মফিজুলের কাছ থেকে প্রশ্ন যেত পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মোহাম্মদ রুবেল ইসলামের কাছে। তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রুবেল ইসলাম এক সময় কম্পিউটারের দোকান দিয়েছিলেন। ২০২০ সালের দিকে প্রযুক্তির সেই ব্যবসায় অনলাইনে ফরম পূরণ, ডাউনলোডিং, প্রিন্টিং, টাইপিং করতে গিয়ে প্রশ্নফাঁস চক্রে জড়িয়ে পড়েন। প্রশ্নফাঁস চক্রের এরপরের লেয়ারের কাউকেই এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ওপরের কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের খবরে তারা গা ঢাকা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধান বলছে, এরপরের লেয়ারে কাজ করতেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সহকারী পরিচালক (সংস্থাপন) সোহাগ ফকির। তার কাছ থেকে প্রশ্ন যেত সিরাজগঞ্জের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও ৩৬তম বিসিএসের কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদের হাতে। এই লেয়ারে হারুন ছাড়াও কাজ করতেন আরও অন্তত ৩ জন। তবে হারুন-সোহাগ সিন্ডিকেট ছিল সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। হারুন ও সোহাগ দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার সময় থেকেই তাদের মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠে। বাকি ৩ কর্মকর্তা হলেন—বিসিএসআইআরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. কাজল আহমেদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির সহকারী পরিচালক মো. রাফিউল ইসলাম ও ভারতখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক হরি প্রসাদ রায়।

জানা গেছে সোহাগের স্ত্রীও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরীক্ষার্থী ছিলেন। নিজের স্ত্রীর কথা বলেই রুবেলের কাছ থেকে এবার যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশ্ন নেয় সোহাগ। রুবেল জানিয়েছেন, নুসরাত জাহান নামের একজনকে সোহাগ তার স্ত্রী বলে দাবি করে তার কাছ থেকে প্রশ্ন নিয়েছে। সেই নুসরাতের অ্যাডমিট কার্ড সংগ্রহ করেছে কালবেলা। সেখানে দেখা যায় তার রোল নম্বর: ১১০০১২৪৮০।

তথ্য বলছে, প্রাথমিক পর্যায়ের পর প্রশ্ন ও নির্দেশনা পৌঁছাত মফিজুল ইসলাম ওরফে রাফির কাছে। সেখান থেকে তা যেত রুবেল ইসলামের হাতে। রুবেলের কাছ থেকে প্রশ্ন পৌঁছে যেত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সহকারী পরিচালক (সংস্থাপন) সোহাগ ফকিরের কাছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই ধারাবাহিক হাতবদলের মধ্য দিয়েই প্রশ্ন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য নেটওয়ার্কের পরবর্তী স্তরে পৌঁছাত। প্রশ্নের এই যাত্রাপথে প্রত্যেকের ভূমিকা ছিল আলাদা—এমন একটি কাঠামোর কথা উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। প্রথম পর্যায়ে প্রশ্ন বা নির্দেশনা সংগ্রহ করা, পরের পর্যায়ে তা নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং এরপর পরীক্ষার্থীদের কাছে সরবরাহের ব্যবস্থা করা হতো। এভাবে একাধিক স্তর পেরিয়ে তথ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকায় নেটওয়ার্কটির কার্যক্রম ছিল বিস্তৃত ও সমন্বিত—এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।

সোহাগ ফকিরের পর নেটওয়ার্কটি দুটি পৃথক শাখায় ভাগ হয়ে কাজ করত বলে জানা গেছে। প্রথম শাখায় ছিলেন সিরাজগঞ্জের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. হারুন অর রশিদ এবং শিক্ষক হরি প্রসাদ রায়। সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের সমন্বয়ে গঠিত এই শাখার মাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হতো। দ্বিতীয় শাখায় ছিলেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. কাজল আহমেদ এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) সহকারী পরিচালক মো. রাফিউল ইসলাম। তাদের নামও প্রশ্নফাঁস নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে উঠে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের যুক্ত করে নেটওয়ার্কটি এমনভাবে পরিচালিত হতো, যাতে প্রশ্ন ও তথ্য একাধিক ধাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানো যায়। এই নেটওয়ার্কের শেষ ধাপ ছিল পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্ন ও উত্তর পৌঁছে দেওয়া।

তথ্য বলছে, পরীক্ষার আগের রাতে চুক্তিভিত্তিক নির্দিষ্ট পরীক্ষার্থীদের গোপন বাসা বা বুথে রাখা হতো। সেখানে তাদের ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহ করে মুখস্থ করানো হতো। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পরীক্ষার হলে যাওয়ার আগেই কিছু পরীক্ষার্থী প্রশ্নের উত্তর জেনে যাওয়ার সুযোগ পেতেন।

জানা গেছে, শেষ লেয়ারে কাজ করা মো. রাফিউল ইসলামের দায়িত্ব ছিল পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন মুখস্থ করানো। তিনি দায়িত্ব পালন করতেন মিরপুর এলাকার। মিরপুরের কালশী রোডের পাশে একটি গোপন বুথে তিনি পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন মুখস্থ করাতেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাদিম মাহমুদ কালবেলাকে বলেন, সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং অর্থের বিনিময়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও প্রতিযোগিতার সমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। একদিকে হাজারো চাকরিপ্রার্থী বৈধ পথে প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন, অন্যদিকে কেউ যদি অর্থের বিনিময়ে আগাম প্রশ্ন বা উত্তর পাওয়ার সুযোগ পান, তা হলে মেধা ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, প্রশ্নফাঁসের বিষয়টিকে আমার কাছে নতুন বা বিচ্ছিন্ন কিছু মনে হয় না; এটি বর্তমানে একটি সিস্টেমে দাঁড়িয়ে গেছে। শিক্ষা খাতে প্রশ্নফাঁস নিয়ে আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট গবেষণা ছিল, যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ ধরনের সিন্ডিকেটের ভূমিকা দেখা গেছে। অপরাধ যখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়, তখনই তা এভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

প্রাথমিকভাবে বিষয়টি প্রকাশ করায় গণমাধ্যমকে ধন্যবাদ দিতে হয় মন্তব্য করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমানে গভীর তদন্ত হচ্ছে, সেটি ভালো বিষয়। তবে মূল যে বিষয়টি দেখতে হবে তা হলো—যারা সামনে সরাসরি জড়িত, তাদের পেছনে উচ্চপর্যায়ের কোনো বিশেষ মহল রয়েছে কি না? চিহ্নিত অপরাধীদের অনেকেই তো ওই মন্ত্রণালয়ের বাইরের লোক। ফলে মন্ত্রণালয়ে সরাসরি যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত বা প্রশ্ন কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এ ধরনের প্রশ্নফাঁস কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যেমন এর আগে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) ক্ষেত্রে একজন ড্রাইভারকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। উচ্চপদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে একজন ড্রাইভার একা প্রশ্ন ফাঁস করে ফেলবে—যারা এমনটি ভাবেন এবং এতেই সমাধান খোঁজেন, তারা মূলত মূর্খের রাজ্যে বাস করছেন।

তিনি বলেন, মূলত সর্ষের মধ্যেই ভূত রয়ে গেছে। যাদের এই অপরাধ প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করার কথা, তাদেরই একাংশ এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে চক্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। তাই সংবাদমাধ্যম বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কেবল যারা চিহ্নিত হচ্ছে, তাদের জবাবদিহিই যথেষ্ট নয়; এর পেছনে থাকা বৃহত্তর শক্তি, যোগসাজশকারী এবং সুরক্ষাকারীদেরও চিহ্নিত করে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

ব্রিফিংয়ে যা বলেছে এসআরবি

প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টায় এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে একটি ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। সেখানে বক্তব্য দেন এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন। তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় এসআরবি গোয়েন্দা দলের গোপন অনুসন্ধানে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। এর ভিত্তিতে ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী রয়েছেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ, উত্তর প্রস্তুত ও বিতরণ করত। মোবাইল ফোনের চ্যাট ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, নূর মোহাম্মদ ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাকে প্রশ্নপত্রের স্পষ্ট ছবি পাঠান। নূর প্রশ্নের উত্তর প্রস্তুত করে জাহাঙ্গীর ও এমদাদুলকে পাঠান। পরে চক্রের সদস্যরা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে সেগুলো পরীক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করেন। ১৪ অক্টোবর মতিঝিল থেকে রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর এস এম এমদাদুল রহমান ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ১৫ অক্টোবর সাভার থেকে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ এবং ১৬ অক্টোবর মোহাম্মদপুর থেকে এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে ১১৬টি ১০০ টাকার স্ট্যাম্প, চারটি ৫০ টাকার স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার ১৯ পাতা প্রবেশপত্র, ২৫টি সার্টিফিকেট, ৪৯টি ব্যাংক চেক ও চেকের পাতা, আটটি মোবাইল ফোন, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ৪ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন, গত ১০ অক্টোবর পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষার ঠিক আগমুহূর্তে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সামনে আসায় তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরে ১৬ অক্টোবর পরীক্ষাটি আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় এসআরবি অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। এ ঘটনায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ জড়িত ছিলেন কি না, কিংবা বাইরে থেকে কারা জড়িত ছিলেন, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটিত হলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

দেশ টাইমস প্রতিবেদন

স্বাগতম The Desh Times আপনাদের বিশ্বস্ত খবরের ঠিকানা। আমরা সত্যকে গুরুত্ব দিই, গুজবকে নয়। দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ খবর, আমাদের মূল লক্ষ্য—নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা এবং দর্শকদের জন্য তথ্যপ্রাপ্তির স্বাধীনতা। আপনার বিশ্বাসই আমাদের প্রেরণা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *